ইনসুলিন আবিষ্কারে কুকুরের ভূমিকা।

0
Table of content

  (toc) #title=(Table of Content)


  ডায়াবেটিস এবং ইনসুলিন আবিষ্কার

আমরা খাবার কেন খাই? উত্তর খুবই সহজ শরীরে শক্তি পাওয়ার জন্য, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের যাবতীয় কাজ করি। এখন মনে করুন আপনি প্রচুর খাবার খাচ্ছেন। এবং সেই খাবার হজমও হচ্ছে। কিন্তু সে খাবার থেকে কোন শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে না।


তাহলে কি হবে? 

এক্ষেত্রেও উত্তর খুবই সহজ। আপনি দ্রুত রুগ্ন হয়ে মারা যাবেন। খাদ্য গ্রহণ করার পরেও সেই খাদ্য থেকে শক্তি উৎপন্ন না হবার বিষয়টিকে বলা হয় ডায়াবেটিস।


যা আমাদের অতি পরিচিত একটি সমস্যা, তবে আমাদের অনেকেরই ধারণা ডায়াবেটিস শুধুমাত্র বয়স্ক মানুষের হয়ে থাকে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। ডায়াবেটিস শিশুদেরও হয়ে থাকে। কোন একজন ব্যক্তি খাদ্য গ্রহণ করার পর সেই খাদ্য থেকে শক্তি উৎপন্ন হবে কিনা, এই বিষয়টি নির্ভর করে ইনসুলিন নামক হরমোনের ওপর।


👉গর্ভাবস্থায় নাক থেকে রক্ত পড়ে কেনো?


ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের শরীরে হয় ইনসুলিন তৈরি হয় নয়তোবা ইনসুলিন তৈরি হলেও যথাযথভাবে কাজ করে না। যার ফলে ইনসুলিন আবিষ্কার হওয়ার আগে পর্যন্ত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির নিশ্চিত পরিণতি ছিল দ্রুত মৃত্যু।


যদিও ইনসুলিন আবিষ্কার হওয়ার পর দৃশ্যপটে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে আমাদের পরিচিত অনেকেই নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ করে থাকেন। 


জীবন রক্ষাকারী এই ইনসুলিন আবিষ্কারের পেছনে কিন্তু কুকুরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আজকের আলোচনায় ইনসুলিনের আবিষ্কার এবং ইনসুলিনের সাথে ডায়াবেটিসের যোগ সূত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।


ডায়াবেটিস খুবই প্রাচীন একটি সমস্যা, তবে প্রথম ডকুমেন্ট পাওয়া যায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ইজিফটেড ইদাস পায়রাসে , সেখানে বিষয়টিকে ঘন ঘন প্রসাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। 

২০০৬ শত বছর আগে ইন্ডিয়াতে হানি ইউরিন নামে উল্লেখ করা হয়। প্রাচীন চিনে একে বলা হয় wasting thirst.


তবে ডায়াবেটিস এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন Apollollonius memphis খ্রিস্টপূর্ব আড়াইশো থেকে ৩০০ বছর আগে। এটি একটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ। তখনো পর্যন্ত ডায়াবেটিস কেন হয়, শরীরের কোন অঙ্গের সাথে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক রয়েছে, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে তেমন কোন ধারনাই ছিল না।


পরবর্তীতে ১৫০ সালের দিকে galen of pergamon সর্বপ্রথম কিডনির সমস্যা বলে উল্লেখ করেন, কারণ তিনি লক্ষ্য করেন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পর পর্যন্ত ডায়াবেটিস কে কিডনির সমস্যা বলে মনে করা হয়।

তবে galen এর প্রায় ১ হাজার ৭০০ বছর পর 1889 সালে oskar minkowski এবং joseph von mering প্রথমবারের মতো ডায়াবেটিসের সাথে প্যানক্রিয়াস বা অগ্নাশয় এর গুরুত্বপূর্ণ জোকসূত্র খুঁজে পান। তারা খেয়াল করেন কোন একটি কুকুরের শরীর থেকে যদি অগ্নাশয় আলাদা করে ফেলা হয়, তবে কুকুরটি ইমিডিয়েটলি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।


এবং কিছুদিন পরে মারা যায়। যা ডায়বেটিস বোঝার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল। এর মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে ডায়াবেটিসের সাথে অগ্নাশয় সরাসরি জড়িত। 


ইনসুলিনের আবিষ্কারক

পরবর্তীতে অনেকেই অগ্নাশয় কিভাবে ডায়াবেটিসের সাথে সম্পৃক্ত তা বোঝার চেষ্টা করেন। এবং চূড়ান্ত সাফল্য আসে 1921 সালে। Frederick Banting এবং Charles best এর হাত ধরে। তবে তাদের সাফল্যের কথা বলার আগে ডায়াবেটিস আসলে কি তা বলা যাক। 

আমাদের গ্রহণ করা খাদ্যের মধ্যে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্লুকোজ বা সুগারে পরিণত হয়ে রক্তের মাধ্যমে শরীরের সকল কোষে পৌঁছায়।


এখন রক্ত উপস্থিতি, সুগার কোষে প্রবেশ করার জন্য এক ধরনের হরমোনের প্রয়োজন হয়, এবং এই হরমোন হচ্ছে ইনসুলিন। ইনসুলিন এক প্রকার চাবির মতো কাজ করে। ইনসুলিন এর উপস্থিতিতে সুগার বা গ্লুকোজ কোষের প্রবেশ করতে পারে।


পরবর্তীতে কোষ সেই সুগারকে ভেঙ্গে শক্তিতে । উৎপন্ন করে। ফলে আমাদের শরীর সক্রিয় থাকে। 

এখন কোন কারনে শরীর যদি রক্তে থাকা সুগারের বিপরীতে যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে তবে রক্ত থাকা সুগার রক্তেই থেকে যায়।


ফলে রক্তের সুগার লেভেল বেড়ে যায়, এবং একেই বলা হয় ডায়াবেটিস।


ডায়াবেটিস কত প্রকার 

ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের এক নম্বর হচ্ছে টাইপ ওয়ান দুই নম্বর হচ্ছে টাইপ টু।


টাইপ 1 : 

টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অগ্নাশয় একদম ইনসুলিন তৈরি করে না। এমন ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি প্রতিদিন আলাদা করে ইনসুলিন গ্রহণ না করেন তবে অল্পদিনের মধ্যেই মারা যান। সাধারণত কম বয়সী মানুষের মধ্যে টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস দেখা যায়। এবং মোট ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে দশ শতাংশ মানুষের মধ্যে টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস দেখা যায়।


টাইপ 2:

টাইপ টু ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে শরীর হয় যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করে না অথবা যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করলেও তা সঠিকভাবে কাজ করে না। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত বয়স্ক বা অনেক চর্বি জাতীয় মোটা মানুষের মধ্যে দেখা যায়। 



এখনডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে কি কি লক্ষণ দেখা যায় তা বলা যাক


ডায়াবেটিসে রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যাবার ফলে শরীর অতিরিক্ত সুগার বাহিরে বের করে দিতে চাই। এমন ক্ষেত্রে কিডনি রক্তকে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত ফিল্টার করতে থাকে। যার ফলে ঘন ঘন প্রসাবের প্রবণতা তৈরি হয়। এখন ঘন ঘন প্রসাবের ফলে শরীর থেকে বেশি পরিমাণে পানি বের হয়ে যায়।


যার ফলে ঘন ঘন পানির তৃষ্ণা তৈরি হয়। আবার রক্তে অতিরিক্ত সুগার থাকার কারণে কোন স্থান কেটে গেলে তা সহজে শুকায় না। কারণ রক্তে বেশি সুগার থাকার মানে হচ্ছে সেই অংশে খুব সহজেই ব্যাকটেরিয়া বংশ বিস্তার করতে পারে। ফলে ক্ষতস্থান সহজে শুকায় না।


রক্তে অতিরিক্ত সুগার থাকালে তা চোখের লেন্সে জমা হয়। এতে লেন্সে থাকা লিকুইড ঝাপসা হয়ে যাই। যার ফলে দৃষ্টিশক্তি ও ঝাপসা হয়ে আসে।


ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে যেহেতু গ্লুকোজ ভেঙ্গে শক্তি উৎপন্ন হতে পারে না। সেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তি অল্পতেই ক্লান্তি বোধ করেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজ করতে অক্ষম হয়ে যান। কিন্তু তখন ও শরীর সক্রিয় থাকার জন্য শক্তির প্রয়োজন। ফলে তখন শরীরে থাকা ফ্যাট মাসল টিস্যু এগুলো ভাঙতে থাকে।


এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুতই রুগ্ন হতে থাকেন। অর্থাৎ ওজন কমতে থাকে। টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে এ লক্ষণগুলো খুবই দ্রুত দেখা যায়। অন্যদিকে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।


ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, শরীরের সুগার এবং ইনসুলিন এর সমতা থাকতে হবে। এখন কোন কারণে যদি শরীর নিচ থেকে এসমতা তৈরি করতে না পারে, তবে আর্টিফিশিয়ালি সমতা নিয়ে আসতে হবে। এবং এই আর্টিফিশিয়ালি সমতল ক্ষেত্রে প্রয়োজন ইনসুলিন।


যার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই ১৯২১ সালে। Frederick Banting এবং Charles best এর সময়ে। ১৯২১ সালের আগে পর্যন্ত টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে নিশ্চিত পরিণতি ছিল মৃত্যু।


অনেক শিশু অতি দ্রুতই মৃত্যুবরণ করছিল। যদিও চিকিৎসকদের এক অর্থে কিছুই করার ছিল না, তবে সে সময়টাই সার্জেন্ট Frederick Banting অগ্নাশয় এর যে অংশ থেকে হরমোন তৈরি হয়, তা থেকে নিশ্রিত পদার্থ আলাদা করে ডায়াবেটিস রোগীর শরীরে প্রয়োগের চিন্তা করেন।


কিন্তু এ কাজ করার জন্য তার একটি ল্যাবের প্রয়োজন ছিল। ফলে Banting তার আইডিয়া নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো তে যান। সেখানে তার গবেষণার সহযোগী হিসেবে স্টুডেন্ট চার্লস বেস্ট কে সাথে দেয়া হয়।


তারা ১৯২১ মে তে গবেষণা শুরু করেন। এবং এ গবেষণায় তারা ব্যবহার করেন কুকুর। তারা প্রথমে কুকুরের অগ্নাশয় আলাদা করে কুকুরটিকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত করেন। পরবর্তীতে আলাদা করা অগ্নাশয় থেকে কাঙ্খিত হরমোন আলাদা করার চেষ্টা করেন। এবং তারপর সে হরমোন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কুকুরের শরীরে প্রবেশ করান।


তাদের এই এক্সেলপেরিমেন্ট চলাকালে অনেক কুকুর মারা যায়। প্রত্যেকটা কুকুরের ওই আলাদা আলাদা নাম্বার ছিল। 

ইনসুলিন কত সালে আবিষ্কার হয়?

ফাইনালি তারা ১৯২১ এর জুলাই মাসে 27 তারিখে সাফল্য পাই।





এই সেই কুকুর যার মাধ্যমে তারা সাফল্য পেয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের সাথে যুক্ত হয় james collipi তিনি ছিলেন একজন বায়ুকেমিস্ট। তারা গরুর শরীর থেকে ইনসুলিন আলাদা করে তা পিউরিফাই করে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে প্রয়োগ করেন দিনটি ছিল ১১ জানুয়ারি ১৯২২।


১৪ বছরের ছেলে leonand thompson এ শরীরে ডোজ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই প্রথম ডোজ ফেল করে। পরবর্তীতে ইনসুলিন পিউরিফাই করার বিষয়টিতে পরিবর্তন এনে ১২ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ করা হয়। এবং তা চমৎকারভাবে কাজ করে। এবং সাথে সাথে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচনা তৈরি করে।


Banting,MccLeDD, Best,Collip

জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিন তৈরি করার জন্য হাজার ১৯২৩ সালে মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথম দিকের ইনসুলিন তৈরি হতো গরু কিংবা শূকরের অগ্নাশয় থেকে।


যা শত শত শিশুকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে। Frederick Sanger ইনসুলিনের প্রাইমারি স্ট্রাকচার আইডেন্টিফাই করেন। যার ফলে ১৯৫৮ সালে তাকে কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। 


১৯৭৮ সালের আগে পর্যন্ত এনিমেল বেজ ইনসুলিন ব্যবহার করা হতো। যদিও এক্ষেত্রে এলার্জি সংক্রান্ত সমস্যা ছিল। তবে 1978 সালে Ricombinant DNA🧬 প্রযুক্তিতে ল্যাবে ইনসুলিন উৎপাদন শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে মানুষের জ্বিন নেয়া হয় । 


যাতে ইনসুলিন উৎপাদনের কোড থাকে। পরবর্তীতে এই জ্বীন প্লাজ মিডে যুক্ত করে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়। এবং ওই ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির সাথে সাথে ইনসুলিন তৈরি হতে থাকে। এবং এরপর ব্যাকটেরিয়া থেকে ইনসুলিন আলাদা করে বাজারজাত করা হয়।


যাদের টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের জন্য ইনসুলিন অত্যাবশ্যক। অন্যদিকে যাদের টাইপ 2 ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন অত্যাবশ্যক না হলেও নিয়ম তান্ত্রিক জীবন যাপন এবং মেডিসিনের মাধ্যমে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়।


ডায়াবেটিস এমন একটি সমস্যা যা কখনোই ভালো হয় না। শুধুমাত্র ইনসুলিন কিংবা নিয়ম তান্ত্রিক জীবন যাপনের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়।


বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এবং এদের একটি অংশকে নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিন যদি আবিষ্কার না হতো তবে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারতো না। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল এর আগেই মারা যেতেন। Banting এবং best এর জীবন 

রক্ষাকারী এই জাদুকরি ঔষধ এবং এর জন্য আত্মহতি কুকুর গুলোর কথা মানুষ মনে রাখবে।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)